ফ্রিল্যান্সিং ছোটগল্পঃ ফ্রিল্যান্সারের প্রতিশোধ!

গত বছর প্রথম লকডাউনের কথা। ঢাকায় খুব কড়াকড়ি ভাবে লকডাউন শুরু হয়েছে। সবাই ঘরে বন্দি, অনেকের কাজ চলে গেছে। কিন্তু ফ্রিল্যান্সার হিসাবে আমার কাজ বন্ধ ছিল না, বরং কাজ আরও বেড়েছিল। এমনিতেই চার দেয়ালের মাঝে নিজেকে বন্দি করে রেখেছি অনেক দিন। কাজেই এই লকডাউন আমার কাছে নতুন কিছু না। আসলে আমিত লকডাউনে আছি অনেক দিন ধরেই। খাওয়া, ঘুমানো, আর বায়ারের কাজ, আর মাঝে মাঝে মটরসাইকেলে লংড্রাইভে ঘুরতে যাওয়া। এভাবেই দিনগুলো চলে যাচ্ছিল। আমার এই ভাগ্য দেখে, জানি আপনাদের অনেকেরই ঈর্ষা হচ্ছে।
 
ব্যাপারটা আসলে এত সহজ না। প্রত্যেকের জীবনে কিছু খুঁজলি টাইপের মানুষ থাকে। যাদের কাজ হচ্ছে, কারনে অকারণে আপনাকে চুলকানো। আমার জীবনেও ছিল, আর সে হচ্ছে আমাদের বাড়ীওয়ালা। ঢাকার বুকে ৫ তালা বাড়ি করে, নিজেকে রাজা বাদশা মনে করে। ভাড়াটিয়াদের পিছনে লাগা ছাড়া, তার তেমন কোন কাজ নেই। বাসার লোকেশন ভাল বলে, ভাড়াটিয়ারা সহজে বাসা ছাড়তে চায় না। আর এটাই তার গর্বের যায়গা। কোন ভাড়াটিয়া দেয়ালে ঠোকাঠুকি করলেই, দৌড়ে এসে বলে, ভাই আমার কলিজায় শুধু পেরেক না, গজাল মারেন, তবু আমার দেয়ালে কিছু কইরেন না। আমি সহ্য করতে পারব না। বুঝেন অবস্থা 😀
 
আমাদের সেই বাড়িওয়ালা, কেন আমার মত একজন নির্বিবাদী মানুষের পিছনে লেগেছিল, সেটা এক রহস্য বটে। দিন নেই রাত নেই, তার কাজ ছিল আমাকে খোঁচানো। আমার মায়ের কান ভারি করে প্রায়ই বলত, ভাবি ভাল করে দেখেন, আপনার ছেলে মনে হয় নেশা টেশা করে। সারারাত জেগে থাকে, সারাদিন ঘুমায়, মাঝে মাঝে চোখ লাল দেখি। সবার সাথে খুব একটা মেশে না। আমার মা যতই তাকে বুঝায়, যে আমি ফ্রিল্যান্সিং করি, বিদেশী বায়ারের কাজ করি। ততই সে নাছোড় বান্দা। বলে ভাবি আপনার ছেলের পিসি ভাল করে চেক করেন, মনে হয় পিসিতে আজে বাজে ভিড়িও আছে। দেখেন না, আপনার ছেলেটা দিন দিন কেমন শুকিয়ে আচ্ছে। সে জানে না, আমার মা আমার সব থেকে কাছের বন্ধু। তার সব কথাই আমার কানে আসে। যত এসব শুনতাম, ততই তার প্রতি ঘৃণা বাড়তে থাকত। কিভাবে এসবের প্রতিশোধ নেয় যায়, সেট নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম। তার কোন সাইট নাই, থাকলে হ্যাক করে উড়ীয়ে দিতাম। তার কোন ফেসবুক প্রফাইল নেই, যে ফেক মেয়ে প্রফাইল থেকে ফ্রেন্ড রিকয়েস্ট পাঠিয়ে তাকে ছ্যাকা দেব। সে বাটন মোবাইল ইউজ করে, তাই কিছু করার নেই। ব্যাটা আসলে খুবই চালাক >:( প্রতিশোধ নেয়ার কোন সুযোগ রাখেনি।
 
তার একমাত্র সুন্দরী মেয়ে নিয়ে, তার গর্বের শেষ নেই। তার খুব ইচ্ছা মেয়েকে বিসিএস ক্যাডার বানাবে। মেয়েটাও দিন নেই রাত নেই, কোচিং নিয়ে ব্যাস্ত, বাপের স্বপ্ন পুরন করতে হবে যে। বাড়ীওয়ালা একদিন আমাকে খোঁচা দিয়ে বলেছিল, আমার মেয়ের থেকে একটু শিক্ষা নাও। চাকরি বাকরির জন্য ট্রাই কর। যে কাজ কর, তাতে কোন মেয়ের বাপ তোমার কাছে মেয়ে দেবে না। এই কথা শোনার পরে, মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মনে মনে বললাম ব্যাটা, তোর মেয়ের মত চারটা বউ পালার সামর্থ্য আছে। দেশে ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠিত নেই, না হলে সবাইকে দেখিয়ে দিতাম 😀 আসলে তার এসব খোঁচা মারা কথা শুনে, প্রতিশোধের নেশায় পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। একদিন খেয়াল করে দেখলাম যে, এই কঠোর লকডাউনের মধ্যে, খুব ভোরে, মহল্লার বাঁশের ব্যারিকেডের নিচে দিয়ে, সে যেন কোথায় যায়। একদিন ফলো করে দেখলাম, সে আসলে গোপনে বিড়ি সিগারেট কিনতে যায়। মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি চলে এল।
 
একদিন কালো প্যান্ট, গেঞ্জি আর বুট পরে, খুব ভোরে মহল্লার দেয়াল ঘেসে লুকিয়ে রইলাম। হাতে বড় লাঠি, বাঁশি আগে থেকেই রেডি ছিল। দেখলাম বিড়ীখোর বাড়ীওয়ালা, বিড়ির নেশায় ব্যারিকেডের বাঁশের নিচ দিয়ে পার হাচ্ছে। আমিও হল্ট হল্ট বলে বাঁশি ফুঁকাতে ফুকাতে দ্রুত চলে এলাম। বেচারা ভয়েতে বাঁশের নিচে আটকে গেল। এইত সুযোগ, লাঠি দিয়ে কষে পাছায় কয়েকটা বাড়ি দিলাম। স্যার ভুল হয়ে গেছে, বলে সে দুই হাতে ক্ষমা চাইতে লাগল। যা ব্যাটা ভাগ, বলতেই সে পাছা ডলতে ডলতে, দৌড়ে কোথায় যেন পালাল। আমি দ্রুত লুকিয়ে ঘরে চলে এলাম। জামা কাপড় চেঞ্জ করে ভদ্র ছেলের মত শুয়ে পড়লাম। এমন ভাবে প্রতিশোধ নিতে পেয়ে এক আদিম সুখ অনুভব করলাম। উত্তেজনায় ঘুমাতে পারিনি। কয়েক ঘন্টা পরে, মা ঘরে এসে উত্তেজত হয়ে বলল, শুনেছিস খোকা, আমাদের বাড়ীওয়ালা ভোরে সিগারেট কিনতে যেয়ে, র‍্যাবের হাতে বেদম পিটুনি খেয়েছে। তুই কিন্তু ভুলেও যেন বাহিরে না যাস। এত ভোরে র‍্যাব কি করে, তাও আবার অস্ত্র ছাড়া, লাঠি হাতে 😀 কারো মনে কোন প্রশ্ন নেই। মানুষ এত বোকা হয় কি করে। যা হোক সহানুভুতি দেখাবার জন্য,, বাড়ীওয়ালাকে দেখতে গেলাম। দেখি বেচারা বিছানায় উপর হয়ে শুয়ে, ব্যাথায় কাতরাচ্ছে। তার সুন্দরী মেয়েটা বাবার সেবা করছে। দেখে আসলে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি মনে হয় বেশি জোরে দিয়ে ফেলেছিলাম :'( তাকে সহানুভূতি জানালাম, বললাম আমি থাকতে কোন চিন্তা নেই। যে কোন সময় বলবেন আমি আছি।
 
সেই ঘটনার পরে এক বছর পার হয়ে গেছে। নিজের কাছে এখন খারাপ লাগে, নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আসলে শ্বশুর আব্বার সাথে, এটা করা উচিৎ হয় নাই। ইয়ে মানে, ঠিকই শুনেছেন 😉 উনি আমার শ্বশুর আব্বা হবেন জানলে, সত্যিই এই প্রতিশোধ নিতাম না। পরের ঘটনাগুলো খুবই সংক্ষিপ্ত। লকডাউন শুরু হবার পরে, শ্বশুর আব্বার ভাড়াটিয়ারা, একে একে সব গ্রামে চলে গেল। শুধু আমরাই ছিলাম। বাড়ি ভাড়ার টাকায়, এতদিন রাজার হালে চলা মানুষটার অবস্থা, খুবই করুন হয়ে পড়েছিল। তার বেশ কিছু ঋণ ছিল, পাওনাদারেরা খুব তাগাদা দিচ্ছিল। সেগুলো শোধ করার জন্য আমি হেল্প করি, বেচারার মান রক্ষা হয়। তার মেয়ের বিসিএস শিকেয় উঠে যায়। সে আমাকে খুব করে ধরে, তার মেয়েকে যেন ফ্রিল্যান্সিং শিখিয়ে দেই। ফ্রিল্যান্সিং করতে যেয়ে, এটা ভাল করেই শিখেছি যে, কোন সুযোগ আসলে কিভাবে সেটা লুফে নিতে হয় এবং কিভাবে তা কাজে লাগাতে হয়। আমিও দেখলাম এটা একটা বড় সুযোগ। মানে মানব সেবা করার 😉 তার মেয়েকে ফ্রিল্যান্সিং শেখানো শুরু করার, ১ মাসের মাথায় আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। আগ্রহটা আসলে তাদেরই বেশি ছিল। এই লকডাউনে ঘরে বসে, লাখ টাকা কামানো জামাই সহজে পাওয়া যায় না। তার উপর আমার মত এমন নম্র ভদ্র একজন।
আমার শ্বশুর আব্বা এখন আমাকে নিয়ে গর্ব করে। সুযোগ পেলেই সবার সামনে আমার প্রশংসা করে। তার মেয়ে, মানে আমার স্ত্রী, সেও এখন ফ্রিল্যান্সার। করোনাকালে অনেকেই অনেক কিছু হারালেও, করোনাকাল আমাকে দুহাত ভরে দিয়েছে। একেই বলে কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ 😀
 
(গল্পটা বাস্তব ঘটনার ছায়া অবলম্বনে। তবে কারো সাথে মিলে গেলে, সেটা কাকতালীয় ব্যাপার মাত্র )

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *